বাংলা ভাষা ও সাহিত্য · পাতা ২৬
৫০১. রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কবিতা কোন ছন্দে রচিত? (৩০তম বিসিএস, ২০১০)
- কস্বরবৃত্ত
- খঅক্ষরবৃত্ত
- গমন্দাক্রান্তা
- ঘমাত্রাবৃত্ত
সঠিক উত্তর: ঘ. মাত্রাবৃত্ত
প্রশ্নটি রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী কবিতার ছন্দ জানতে চেয়েছে। কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা, প্রতিটি চরণে আট আর পাঁচ মাত্রার পর্ব।
প্রথম চরণ ধরি: গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা। গগনে তিন মাত্রা, গরজে তিন, আর মেঘ রুদ্ধ দল বলে দুই মাত্রা; মোট আট। ঘন দুই আর বরষা তিন, মোট পাঁচ।
মাত্রাবৃত্তের চিহ্ন হলো রুদ্ধ দল, মানে ব্যঞ্জনে শেষ হওয়া অক্ষর, সবসময় দুই মাত্রা পায়। লয় মাঝারি, পড়তে গানের মতো দোলা লাগে। স্বরবৃত্তে পর্ব হয় চার মাত্রার আর লয় দ্রুত, ছড়ার মতো।
ফাঁদ হলো মন্দাক্রান্তা বিকল্পটি। এটি সংস্কৃত ছন্দের নাম, কালিদাসের মেঘদূতের ছন্দ; মেঘ শব্দ দেখে অনেকে মিলিয়ে ফেলেন, কিন্তু সোনার তরী বাংলা মাত্রাবৃত্তে লেখা।
মনে রাখুন: রুদ্ধ দল সবসময় দুই মাত্রা ধরে পর্ব মিললে মাত্রাবৃত্ত; এক মাত্রা ধরে চার মাত্রার পর্ব মিললে স্বরবৃত্ত।
৫০২. ‘সাহচর্য’ শব্দের শুদ্ধ গঠন কোনটি? (৩০তম বিসিএস, ২০১০)
- কসহ + চর + র্য
- খসহচর + ৎ ফলা
- গসহচর + য
- ঘকোনটিই নয়
সঠিক উত্তর: গ. সহচর + য
প্রশ্নটি সাহচর্য শব্দের গঠন জানতে চেয়েছে। শব্দটি সহচর আর য প্রত্যয় মিলে তৈরি; সংস্কৃত ব্যাকরণে এটি ষ্ণ্য প্রত্যয়, যার য অংশটুকু শব্দে থাকে।
এই প্রত্যয়ের বিশেষত্ব হলো আদিস্বরের বৃদ্ধি। সহচরের প্রথম অক্ষর স-এর অ বৃদ্ধি পেয়ে আ হয়, ফলে স হয় সা। শেষের র আর য মিলে লেখা হয় র্য।
একই নিয়মে বিশেষণ থেকে বিশেষ্য হয়: সুন্দর থেকে সৌন্দর্য, মধুর থেকে মাধুর্য, ধীর থেকে ধৈর্য, পণ্ডিত থেকে পাণ্ডিত্য। প্রথম স্বর বদলে যাওয়াই এই প্রত্যয় চেনার সূত্র।
ফাঁদ হলো সহ যোগ চর যোগ র্য বিকল্পটি, কারণ শব্দের শেষে র্য দেখা যায়। কিন্তু র্য কোনো প্রত্যয় নয়, আর এভাবে ভাঙলে স থেকে সা হওয়ার কোনো ব্যাখ্যা থাকে না।
মনে রাখুন: আরও উদাহরণ: সুন্দর + য = সৌন্দর্য, মধুর + য = মাধুর্য, ধীর + য = ধৈর্য, পণ্ডিত + য = পাণ্ডিত্য।
৫০৩. ‘পাহাড়তলী’ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন- (৩০তম বিসিএস, ২০১০)
- কমুকুন্দরাম চক্রবর্তী
- খসৈয়দ শামসুল হক
- গশামসুর রাহমান
- ঘসেলিম আলদীন
সঠিক উত্তর: গ. শামসুর রাহমান
প্রশ্নটি জানতে চেয়েছে কোন কবির গ্রামের বাড়ি পাহাড়তলী নামে। উত্তর শামসুর রাহমান। তাঁর পৈতৃক নিবাস নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার পাড়াতলী গ্রামে; প্রশ্নে নামটি পাহাড়তলী ছাপা হয়েছে।
সূক্ষ্ম তথ্যটি মনে রাখুন: শামসুর রাহমানের জন্ম ১৯২৯ সালে পুরান ঢাকায়, আর পাড়াতলী তাঁর পৈতৃক গ্রাম। পরীক্ষায় দুটো তথ্যই আলাদাভাবে আসে।
তিনি নাগরিক কবি নামে পরিচিত। স্বাধীনতা তুমি আর তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা তাঁর বিখ্যাত কবিতা, প্রথম কাব্য প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে।
পাহাড়তলী নামে চট্টগ্রামে একটি পরিচিত এলাকা আছে, তাই নামটি বিভ্রান্তিকর। অন্য তিন বিকল্পের লেখকদের জন্মস্থান স্পষ্ট আলাদা: মুকুন্দরাম বর্ধমানের দামুন্যায়, সৈয়দ শামসুল হক কুড়িগ্রামে, সেলিম আল দীন ফেনীর সেনেরখিলে।
মনে রাখুন: প্রশ্নে পাহাড়তলী এলেও আসল নাম পাড়াতলী; দেখলেই শামসুর রাহমান ভাবুন।
৫০৪. ‘পূর্বাশা’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন – (৩০তম বিসিএস, ২০১০)
- কমুন্সী মেহেরুল্লাহ
- খসঞ্জয় ভট্টাচার্য
- গকামিনী রায়
- ঘমোজাম্মেল হক
সঠিক উত্তর: খ. সঞ্জয় ভট্টাচার্য
প্রশ্নটি পূর্বাশা পত্রিকার সম্পাদকের নাম জানতে চেয়েছে। পূর্বাশা সম্পাদনা করতেন সঞ্জয় ভট্টাচার্য, আর পত্রিকাটির প্রকাশ শুরু হয় কুমিল্লা থেকে।
সঞ্জয় ভট্টাচার্য জীবনানন্দ দাশের অন্যতম প্রধান সমর্থক ছিলেন; পূর্বাশায় জীবনানন্দের অনেক কবিতা ছাপা হয় এবং তিনি জীবনানন্দকে নিয়ে লেখেনও। এই যোগসূত্রটা পরীক্ষায় কাজে আসে।
অন্য নামগুলো অন্য পরিচয়ে বিখ্যাত। মোজাম্মেল হক লহরী ও মোসলেম ভারত পত্রিকার সম্পাদক, কামিনী রায় আলো ও ছায়া কাব্যের কবি, আর মুন্সী মেহেরুল্লাহ যশোরের ইসলাম প্রচারক ও বাগ্মী।
ফাঁদ হলো মোজাম্মেল হক বিকল্পটি, কারণ তিনিও পত্রিকা সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু তাঁর পত্রিকা লহরী আর মোসলেম ভারত, পূর্বাশা নয়।
মনে রাখুন: পূর্বাশা মানে পূর্ববঙ্গের কুমিল্লা আর সঞ্জয় ভট্টাচার্য; সঙ্গে জীবনানন্দ।
৫০৫. ‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসের রচয়িতা কে? (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- কমোহাম্মদ নজীবর রহমান
- খকাজী ইমদাদুল হক
- গশেখ ফজলুল করিম
- ঘমমতাজ উদ্দিন আহম্মেদ
সঠিক উত্তর: খ. কাজী ইমদাদুল হক
আবদুল্লাহ কাজী ইমদাদুল হকের উপন্যাস। এটি প্রথমে মোসলেম ভারত পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়, আর লেখকের মৃত্যুর পর ১৯৩৩ সালে বই আকারে বের হয়।
উপন্যাসে মুসলিম সমাজের কুসংস্কার, পীরপ্রথা, পর্দাপ্রথার বাড়াবাড়ি আর আশরাফ-আতরাফ ভেদাভেদের সমালোচনা আছে। নায়ক আবদুল্লাহ শিক্ষিত, যুক্তিবাদী তরুণ।
মোহাম্মদ নজিবর রহমান এখানে বড় ফাঁদ, কারণ তিনিও একই যুগের মুসলিম সমাজজীবনের ঔপন্যাসিক। তবে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস আনোয়ারা।
শেখ ফজলুল করিম কবি, তাঁর বিখ্যাত পঙ্ক্তি কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর। মমতাজউদদীন আহমদ নাট্যকার, কি চাহ শঙ্খচিল তাঁর নাটক।
মনে রাখুন: একই যুগের দুই মুসলিম সমাজ-উপন্যাস: আবদুল্লাহ ইমদাদুল হকের, আনোয়ারা নজিবর রহমানের।
৫০৬. বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম উপন্যাসের নাম- (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- কদুর্গেশনন্দিনী
- খকপালকুণ্ডলা
- গকৃষ্ণকান্তের উইল
- ঘরজনী
সঠিক উত্তর: ক. দুর্গেশনন্দিনী
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম বাংলা উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী, প্রকাশিত ১৮৬৫ সালে। এটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাসও বলা হয়।
উপন্যাসটি ইতিহাসের পটভূমিতে লেখা রোমান্স; মোগল সেনাপতি জগৎসিংহ আর তিলোত্তমা, আয়েশাকে ঘিরে এর কাহিনি। দুর্গেশনন্দিনী মানে দুর্গের অধিপতির কন্যা।
বাকি তিনটি পরের রচনা: কপালকুণ্ডলা ১৮৬৬, রজনী ১৮৭৭, কৃষ্ণকান্তের উইল ১৮৭৮। জেনে রাখা ভালো, বঙ্কিমের সবচেয়ে প্রথম উপন্যাস ইংরেজিতে লেখা রাজমোহন্স ওয়াইফ, ১৮৬৪ সালে।
কপালকুণ্ডলা ফাঁদ, কারণ এটি ঠিক পরের বছরের এবং বঙ্কিমের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর একটি।
মনে রাখুন: বঙ্কিমের প্রথম তিন: ১৮৬৪ ইংরেজিতে, ১৮৬৫ দুর্গেশনন্দিনী, ১৮৬৬ কপালকুণ্ডলা।
৫০৭. বাংলা বর্ণমালায় স্বরবর্ণ কয়টি? (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- ক১৩ টি
- খ১০ টি
- গ১২ টি
- ঘ১১ টি
সঠিক উত্তর: ঘ. ১১ টি
বাংলা বর্ণমালায় মোট বর্ণ ৫০টি: স্বরবর্ণ ১১টি আর ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৯টি। স্বরবর্ণগুলো হলো অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ।
এর মধ্যে ঐ আর ঔ যৌগিক স্বর, কারণ দুটি স্বরধ্বনি মিলে তৈরি। বর্ণ আর ধ্বনি আলাদা জিনিস: বাংলায় মৌলিক স্বরধ্বনি ৭টি, কিন্তু স্বরবর্ণ ১১টি।
বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়ে স্বরবর্ণ ছিল ১২টি, কারণ তখন লি নামের একটি বর্ণ ছিল, যা পরে বাদ পড়ে। তাই বারো বিকল্পটি পুরোনো হিসাবের ফাঁদ।
ঋ-কে স্বরবর্ণ না ধরলে কেউ দশ বলতে পারেন, কিন্তু বর্ণমালায় ঋ স্বরবর্ণ হিসেবেই আছে।
মনে রাখুন: এগারো আর উনচল্লিশে পঞ্চাশ; বর্ণ আর ধ্বনির সংখ্যা গুলিয়ে ফেলবেন না।
৫০৮. বাংলা সাহিত্যের আদি কবি কে? (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- ককাহ্নপা
- খচেণ্ডনপা
- গলুইপা
- ঘভূসুকুপা
সঠিক উত্তর: গ. লুইপা
চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন, আর এর প্রথম পদের রচয়িতা লুইপা। তাই লুইপাকে বাংলা সাহিত্যের আদি কবি ধরা হয়।
লুইপা বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য, চর্যার প্রাচীনতম কবিদের একজন। তাঁর প্রথম পদের শুরু: কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল, অর্থাৎ দেহ একটি গাছ, তার পাঁচটি ডাল।
কাহ্নপা সবচেয়ে বেশি পদের রচয়িতা, তেরোটি; আর ভুসুকুপা দ্বিতীয়, আটটি পদ। ভুসুকুপা একটি পদে নিজেকে বাঙালি বলেছেন।
সবচেয়ে বড় ফাঁদ কাহ্নপা। সবচেয়ে বেশি পদ লেখা আর প্রথম পদ লেখা এক কথা নয়।
মনে রাখুন: চর্যার তিন রেকর্ড: প্রথম পদ লুইপা, সর্বাধিক কাহ্নপা, নিজেকে বাঙালি বলেছেন ভুসুকুপা।
৫০৯. ‘তৎসম’ শব্দের ব্যবহার কোন রীতিতে বেশি হয়? (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- কচলিত রীতি
- খসাধু রীতি
- গমিশ্র রীতি
- ঘআঞ্চলিক রীতি
সঠিক উত্তর: খ. সাধু রীতি
তৎসম শব্দ মানে সংস্কৃত থেকে অপরিবর্তিত রূপে আসা শব্দ, যেমন চন্দ্র, সূর্য, হস্ত। সাধু রীতিতে এ ধরনের শব্দের ব্যবহার বেশি, তাই সাধু ভাষা গম্ভীর ও আনুষ্ঠানিক শোনায়।
সাধু রীতির আরও দুটি চিহ্ন হলো সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের পূর্ণরূপ: তাহারা, করিয়াছিলাম। চলিত রীতিতে এগুলো সংক্ষিপ্ত হয়: তারা, করেছিলাম; আর সেখানে তদ্ভব ও দেশি শব্দ বেশি।
চলিত রীতি ফাঁদ হতে পারে, কারণ চলিততেও কিছু তৎসম শব্দ থাকে। কিন্তু অনুপাতে বেশি সাধু রীতিতে।
মিশ্র রীতি স্বীকৃত কোনো রীতি নয়; সাধু আর চলিত মেশালে বলে গুরুচণ্ডালী দোষ। আঞ্চলিক রীতিতে বরং আঞ্চলিক ও দেশি শব্দ বেশি থাকে।
মনে রাখুন: সাধু রীতির তিন চিহ্ন: তৎসম শব্দ, পূর্ণ সর্বনাম, পূর্ণ ক্রিয়াপদ।
৫১০. বাংলা ভাষায় প্রথম ব্যাকরণ রচনা করেন কে? (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- কঅক্ষয় দত্ত
- খমার্শম্যান
- গব্রাশি হ্যালহেড
- ঘরাজা রামমোহন
সঠিক উত্তর: ঘ. রাজা রামমোহন
প্রশ্নটি জানতে চেয়েছে বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম ব্যাকরণের লেখক কে। এখানে মূল সূত্র হলো বাংলা ভাষায় লেখা কথাটি; সে অর্থে প্রথম ব্যাকরণ রাজা রামমোহন রায়ের গৌড়ীয় ব্যাকরণ, প্রকাশিত ১৮৩৩ সালে।
এর আগে বিদেশিরা বাংলার ব্যাকরণ লিখেছেন নিজেদের ভাষায়। পর্তুগিজ পাদ্রি মনোএল দা আসসুম্পসাঁও ১৭৪৩ সালে পর্তুগিজ ভাষায়, আর হ্যালহেড ১৭৭৮ সালে ইংরেজিতে।
হ্যালহেড এখানে বড় ফাঁদ। তাঁর বইটিকে বাংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ বলা হয়, এবং এতে প্রথম বাংলা হরফ ছাপা হয়; কিন্তু বইটি ইংরেজিতে লেখা।
অক্ষয়কুমার দত্ত তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক ও প্রবন্ধকার। মার্শম্যান দিগ্দর্শন পত্রিকার সম্পাদক; ব্যাকরণের প্রথম লেখক কেউই নন।
মনে রাখুন: কোন ভাষায় লেখা, তা দেখুন: পর্তুগিজে আসসুম্পসাঁও, ইংরেজিতে হ্যালহেড, বাংলায় রামমোহন।
৫১১. ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থের নাম কি? (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- কসাত সাগরের মাঝি
- খপাখির বাসা
- গহাতেমতাই
- ঘনৌফেল ও হাতেম
সঠিক উত্তর: ক. সাত সাগরের মাঝি
সাত সাগরের মাঝি ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে আলোচিত কাব্যগ্রন্থ, প্রকাশিত ১৯৪৪ সালে। সিন্দাবাদের সমুদ্রযাত্রার রূপকে এখানে মুসলিম জাগরণের ডাক দেওয়া হয়েছে।
শ্রেষ্ঠ কাব্য বাছতে হলে দেখতে হয় কোন বইটি কবির মূল পরিচয় তৈরি করেছে। ফররুখের মুসলিম রেনেসাঁর কবি পরিচয়টাই এসেছে সাত সাগরের মাঝি থেকে।
অন্য বইগুলোও তাঁর, কিন্তু ভিন্ন ধরনের। হাতেম তায়ী কাহিনিকাব্য, নৌফেল ও হাতেম কাব্যনাট্য, আর পাখির বাসা শিশুদের জন্য লেখা।
তিনটি ভুল বিকল্পই ফররুখের রচনা বলে প্রশ্নটা কঠিন মনে হয়; কিন্তু শ্রেষ্ঠ শব্দটি একটাই বই নির্দেশ করে।
মনে রাখুন: ফররুখের প্রশ্নে শ্রেষ্ঠ বা প্রথম আলোচিত কাব্য চাইলে উত্তর সাত সাগরের মাঝি।
৫১২. প্রাচীনতম বাঙ্গালী মুসলমান কবি কে? (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- কআলাওল
- খসৈয়দ সুলতান
- গমুহম্মদ খান
- ঘশাহ মুহম্মদ সগীর
সঠিক উত্তর: ঘ. শাহ মুহম্মদ সগীর
শাহ মুহম্মদ সগীর বাংলা সাহিত্যের প্রথম বা প্রাচীনতম মুসলমান কবি। তিনি সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের আমলে, চোদ্দো শতকের শেষ থেকে পনেরো শতকের শুরুর দিকে, ইউসুফ-জোলেখা কাব্য লেখেন।
ইউসুফ-জোলেখা বাংলায় প্রথম রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানগুলোর একটি; কাহিনির উৎস ধর্মীয় হলেও এতে মানবিক প্রেমের কথা বড় হয়ে উঠেছে।
বাকিরা পরের যুগের কবি। সৈয়দ সুলতান ষোলো থেকে সতেরো শতকের, নবীবংশের কবি। মুহম্মদ খান সতেরো শতকের, মক্তুল হোসেনের কবি। আলাওল সতেরো শতকের আরাকান রাজসভার কবি, পদ্মাবতীর রচয়িতা।
আলাওল ফাঁদ, কারণ তিনি মধ্যযুগের সবচেয়ে বিখ্যাত মুসলমান কবি। কিন্তু বিখ্যাত আর প্রাচীনতম এক নয়।
মনে রাখুন: প্রথম মুসলমান কবি সগীর, প্রথম প্রণয়কাব্য ইউসুফ-জোলেখা; সময় গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের আমল।
৫১৩. ‘চাচা কাহিনী’র লেখক কে? (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- কসৈয়দ শামসুল হক
- খশওকত ওসমান
- গসৈয়দ মুজতবা আলী
- ঘফররুখ আহমদ
সঠিক উত্তর: গ. সৈয়দ মুজতবা আলী
চাচা কাহিনী সৈয়দ মুজতবা আলীর রম্য গল্পগ্রন্থ। জার্মানিতে থাকা বাঙালি তরুণদের আড্ডার মধ্যমণি চাচার মুখে শোনা মজার গল্পগুলো নিয়ে বইটি লেখা।
মুজতবা আলী বহু ভাষা জানতেন এবং রসিক, পাণ্ডিত্যপূর্ণ গদ্যের জন্য বিখ্যাত। তাঁর অন্য পরিচিত বই ভ্রমণকাহিনি দেশে বিদেশে, উপন্যাস শবনম, আর রম্যরচনা পঞ্চতন্ত্র।
সৈয়দ শামসুল হক এখানে ফাঁদ, কারণ নামের শুরুতে দুজনেরই সৈয়দ। কিন্তু শামসুল হক সব্যসাচী লেখক, নূরলদীনের সারাজীবন নাটক আর খেলারাম খেলে যা উপন্যাসের লেখক।
শওকত ওসমানের পরিচয় ক্রীতদাসের হাসি, আর ফররুখ আহমদের সাত সাগরের মাঝি।
মনে রাখুন: দুই সৈয়দ: মুজতবা আলী রম্য ও ভ্রমণের, শামসুল হক নাটক ও কবিতার।
৫১৪. মুসলমান নারী জাগরণের কবি- (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- কফজিলাতুন্নেছা
- খফয়জুন্নেছা
- গবেগম রোকেয়া
- ঘশামসুন্নাহার
সঠিক উত্তর: গ. বেগম রোকেয়া
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বাঙালি মুসলমান নারী জাগরণের অগ্রদূত। তিনি নারীশিক্ষার জন্য সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম নামে নারী সংগঠন গড়েন।
তাঁর লেখা সুলতানার স্বপ্ন, অবরোধবাসিনী, মতিচূর আর পদ্মরাগ নারীর বন্দিত্ব ও অধিকারের প্রশ্ন তোলে। প্রশ্নে কবি শব্দ থাকলেও প্রচলিত উত্তর নারী জাগরণের এই অগ্রদূতকেই ধরে।
নবাব ফয়জুন্নেসা রূপজালালের লেখিকা ও নারীশিক্ষার পৃষ্ঠপোষক। ফজিলতুন্নেসা শিক্ষাবিদ, উচ্চশিক্ষায় বাঙালি মুসলমান নারীদের পথিকৃৎ।
শামসুন্নাহার মাহমুদ লেখিকা ও শিক্ষাবিদ, রোকেয়ার জীবনী লিখেছেন। কয়েকটি গাইড তাঁকে উত্তর ধরে, তাই এটিই এখানে সবচেয়ে বড় দ্বিধা।
মনে রাখুন: নারী জাগরণ শব্দটি দেখলেই বেগম রোকেয়া; ফয়জুন্নেসা মানে রূপজালাল।
৫১৫. ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ এর রচয়িতা কে? (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- কজ্ঞানদাস
- খদীন চণ্ডীদাস
- গবড়ু চণ্ডীদাস
- ঘদীনহীন চণ্ডীদাস
সঠিক উত্তর: গ. বড়ু চণ্ডীদাস
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বড়ু চণ্ডীদাসের রচনা, মধ্যযুগের প্রথম বাংলা কাব্য। ১৯০৯ সালে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ বাঁকুড়ার কাঁকিল্যা গ্রামের এক গোয়ালঘর থেকে এর পুঁথি পান এবং ১৯১৬ সালে প্রকাশ করেন।
বাংলা সাহিত্যে চণ্ডীদাস নামে একাধিক কবি আছেন বলে একে চণ্ডীদাস সমস্যা বলা হয়। বড়ু চণ্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস আর দীন চণ্ডীদাস আলাদা কবি বলে ধরা হয়; শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ভণিতায় নাম আছে বড়ু চণ্ডীদাস।
দীন চণ্ডীদাস পরবর্তীকালের বৈষ্ণব পদকর্তা। দীনহীন চণ্ডীদাস নামটি চণ্ডীদাস সমস্যার সুযোগ নিয়ে বানানো বিকল্প।
জ্ঞানদাস চৈতন্য-পরবর্তী যুগের বৈষ্ণব পদকর্তা, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নেই।
মনে রাখুন: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন মানেই বড়ু চণ্ডীদাস; বাকি চণ্ডীদাসেরা পদাবলির কবি।
৫১৬. বাংলা কথ্য ভাষার আদি গ্রন্থ কোনটি? (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- কপ্রভু যিশুর বাণী
- খকৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ
- গফুলমণি ও করুণার বিবরণ
- ঘমিশনারি জীবন
সঠিক উত্তর: খ. কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ
কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ পর্তুগিজ পাদ্রি মনোএল দা আসসুম্পসাঁওয়ের লেখা। এটি ঢাকার ভাওয়াল অঞ্চলের মুখের ভাষায়, প্রশ্নোত্তরের আকারে খ্রিস্টধর্মের কথা বলে।
বইটি ১৭৪৩ সালে পর্তুগালের লিসবন থেকে রোমান হরফে ছাপা হয়। সাধু বা সংস্কৃতঘেঁষা ভাষায় না লিখে কথ্য ভাষায় লেখা বলে একে বাংলা কথ্য ভাষার আদি গ্রন্থ বলা হয়।
ফুলমণি ও করুণার বিবরণ হানা ক্যাথরিন ম্যালেন্সের লেখা, ১৮৫২ সালের, অনেক পরের রচনা। একে কেউ কেউ প্রথম বাংলা উপন্যাসের দাবিদার বলেন, তাই নামটা পরিচিত লাগে।
প্রভু যিশুর বাণী আর মিশনারি জীবন নামগুলো মিশনারি প্রসঙ্গের সঙ্গে মিল রেখে দেওয়া; কথ্য ভাষার আদি গ্রন্থ হিসেবে এদের কোনো স্বীকৃতি নেই।
মনে রাখুন: আসসুম্পসাঁওয়ের দুই প্রথম: পর্তুগিজে বাংলা ব্যাকরণ, আর কথ্য ভাষার আদি গ্রন্থ কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ।
৫১৭. কবি আলাওলের জন্মস্থান কোনটি? (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- কফরিদপুরের সুরেশ্বর
- খচট্টগ্রামের জোব্রা
- গবার্মার আরাকান
- ঘচট্টগ্রামের পটিয়া
সঠিক উত্তর: খ. চট্টগ্রামের জোব্রা
মহাকবি আলাওল সতেরো শতকের আরাকান রাজসভার কবি। প্রচলিত মত ও পরীক্ষার উত্তর অনুযায়ী তাঁর জন্ম চট্টগ্রামের হাটহাজারীর জোবরা গ্রামে।
তবে জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ আছে। বাংলাপিডিয়াসহ অনেক গবেষকের মতে তাঁর জন্ম ফরিদপুরের ফতেহাবাদ অঞ্চলে; পর্তুগিজ জলদস্যুদের হাতে বন্দি হয়ে তিনি আরাকানে পৌঁছান।
আরাকান তাঁর কর্মস্থল, জন্মস্থান নয়; সেখানে তিনি মাগন ঠাকুরের পৃষ্ঠপোষকতায় পদ্মাবতী লেখেন। এটাই প্রধান ফাঁদ।
ফরিদপুরের সুরেশ্বর বিকল্পটি ফরিদপুর মতের কাছাকাছি, কিন্তু গবেষকেরা ফতেহাবাদের কথা বলেন, সুরেশ্বরের নয়। চট্টগ্রামের পটিয়ার সঙ্গে আলাওলের জন্মের প্রচলিত কোনো যোগ নেই।
মনে রাখুন: আলাওল: জন্ম জোবরা (প্রচলিত), কর্ম আরাকান, কাব্য পদ্মাবতী।
৫১৮. ‘অনল-প্রবাহ’ রচনা করেন- (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- কসৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজি
- খমোজাম্মেল হক
- গএয়াকুব আলী চৌধুরী
- ঘমুনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী
সঠিক উত্তর: ক. সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজি
অনল-প্রবাহ সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর কাব্যগ্রন্থ, প্রকাশিত ১৯০০ সালে। এতে মুসলমান সমাজকে জাগিয়ে তোলার জ্বালাময়ী আহ্বান ছিল।
রাজদ্রোহমূলক বলে ব্রিটিশ সরকার বইটি বাজেয়াপ্ত করে, আর পরে সিরাজী কারাদণ্ড পান। বাংলা ভাষায় রাজরোষে পড়া প্রথম দিকের কাব্যগুলোর একটি এটি।
সিরাজীর অন্য পরিচিত রচনা উপন্যাস রায়নন্দিনী আর ভ্রমণকাহিনি তুরস্ক ভ্রমণ। মোজাম্মেল হক শান্তিপুরের কবি ও জীবনীকার, এয়াকুব আলী চৌধুরী প্রবন্ধকার।
মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী সাংবাদিক ও রাজনীতিক। অনল-প্রবাহের মতো আগুনঝরা নামের কাব্য তাঁদের কারও নয়।
মনে রাখুন: সিরাজী মানে আগুন: অনল-প্রবাহ, বাজেয়াপ্ত কাব্য।
৫১৯. ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যের প্রথম কবিতা কোনটি? (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- কধূমকেতু
- খবিদ্রোহী
- গপ্রলয়োল্লাস
- ঘঅগ্রপথিক
সঠিক উত্তর: গ. প্রলয়োল্লাস
অগ্নিবীণা কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম কাব্যগ্রন্থ, প্রকাশিত ১৯২২ সালে। এতে বারোটি কবিতা আছে, আর প্রথম কবিতা প্রলয়োল্লাস।
প্রলয়োল্লাসের বিখ্যাত চরণ, তোরা সব জয়ধ্বনি কর। পুরোনোকে ভেঙে নতুনের আগমনের ঘোষণা দিয়ে বইটি শুরু হয়, আর তারপরেই আসে দ্বিতীয় কবিতা বিদ্রোহী।
সবচেয়ে বড় ফাঁদ বিদ্রোহী। এটি নজরুলের সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা বলে অনেকে ধরে নেন সেটিই প্রথম, কিন্তু এর অবস্থান দ্বিতীয়।
ধূমকেতু কবিতাটি অগ্নিবীণাতেই আছে, তবে পঞ্চম স্থানে। অগ্রপথিক কবিতাটি অগ্নিবীণার বারোটি কবিতার তালিকায় নেই।
মনে রাখুন: অগ্নিবীণা খোলে প্রলয়োল্লাস দিয়ে, তারপর বিদ্রোহী।
৫২০. বাংলা সাহিত্যে কথ্যরীতির প্রচলনে কোন পত্রিকার অবদান বেশি? (২৯তম বিসিএস, ২০০৯)
- ককল্লোল
- খসবুজপত্র
- গবঙ্গদর্শন
- ঘকালিকলম
সঠিক উত্তর: খ. সবুজপত্র
প্রশ্নটি জানতে চেয়েছে, বাংলা সাহিত্যে চলিত বা কথ্য রীতি প্রতিষ্ঠায় কোন পত্রিকার ভূমিকা সবচেয়ে বড়। উত্তর সবুজপত্র, যা প্রমথ চৌধুরী ১৯১৪ সালে প্রকাশ করেন।
সবুজপত্রের ঘোষিত নীতি ছিল সাধু ভাষার বদলে মুখের ভাষার কাছাকাছি চলিত রীতিতে লেখা। প্রমথ চৌধুরী নিজে বীরবল ছদ্মনামে চলিত গদ্যে প্রবন্ধ লেখেন, আর রবীন্দ্রনাথও এই পত্রিকায় চলিত রীতিতে লেখা শুরু করেন; তাঁর ঘরে বাইরে উপন্যাস এখানেই ধারাবাহিক ছাপা হয়।
তুলনার জন্য মনে রাখুন: বঙ্গদর্শন ১৮৭২ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের পত্রিকা, যার গদ্য ছিল সাধু রীতির। কল্লোল ১৯২৩ সালে আর কালিকলম ১৯২৬ সালে বের হয়; এরা রবীন্দ্র-পরবর্তী আধুনিকতার পত্রিকা, চলিত রীতি তখন আগেই প্রতিষ্ঠিত।
ফাঁদ হলো কল্লোল বিকল্পটি। কল্লোলের লেখকেরা চলিত ভাষায় লিখতেন বলে অনেকে এটিকেই প্রবর্তক ভাবেন, কিন্তু পথটা তৈরি করেছিল সবুজপত্র, প্রায় এক দশক আগে।
মনে রাখুন: চলিত রীতি মানেই প্রমথ চৌধুরী, বীরবল, সবুজপত্র। এই তিনটি একসঙ্গে মনে রাখুন।